পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

১৯৪৯ সালের জুন মাসে কতিপয় মুসলিম লীগ এমএলএ ও কর্মী যারা দলীয় প্রভুদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা ঢাকায় দুদিনব্যাপী সম্মেলনের আয়ােজন করে। সম্মেলনে তারা তরুণ ভিন্নমতাবলম্বী শামসুল হক কর্তৃক লিখিত মূল দাবি নামক পুস্তিকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে। সম্মেলনে তারা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে গণমানুষের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কর্তৃক ৪০-সদস্যবিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব এই সম্মেলনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তারিখে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। তাঁরই সভাপতিত্বে ১৯৪৯ সালের ২৪ জুন পূর্ব। পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তানের তত্ত্বালীন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুসলিম লীগের আরেকটি দলছুট গােষ্ঠী জন্মলাভের বিষয়টি অসাধারণ ছিল না। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত রাজনৈতিক গতিধারা এবং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই ঘটনা একটি নতুন মাত্রা লাভ করে। এই ঘটনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ মূল দলের প্রতি একটি বহুমুখী খােলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারে। কিন্তু এটিও হঠাৎ করে ঘটেনি। ১৯৪০-এর দশকের গােড়ার দিকে প্রণীত বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো ব্যাপকভাবে অনুসরণ করেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম খসড়া ম্যানিফেস্টো তৈরি করা হয়;৯ বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের দলীয় ছাত্র শাখার প্রতিপক্ষ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবর্গ ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করে; ভাষার প্রশ্নে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় তাতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবর্গ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং ১৯৪৭ সালে সূচিত এই বিতর্ক ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে প্রকট রূপ ধারণ করে এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তাতে আরাে গতিবেগ সঞ্চারিত হচ্ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থার প্রসঙ্গে বলা যায় যে পূর্ব পাকিস্তান ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্মুখীন হয়। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জুন তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এর দ্বিতীয় কাউন্সিল সভায় স্বীকার করে যে ক্রমাবনতিশীল বন্যা পরিস্থিতি মােকাবেলা করার ব্যাপারে মুসলিম লীগ সরকারের ঔদাসীন্য কেবল যে সরকারের জন্য অপবাদ বয়ে আনছে তা-ই নয় বরং তা মুসলিম লীগ সংগঠনেরও দুর্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।১০
খাদ্য ঘাটতি ছাড়াও দেশত্যাগী হিন্দুদের মূলধন স্থানান্তর এবং পাকিস্তান কর্তৃক অনুসৃত অর্থনীতির কারণে এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থব্যবস্থার ওপর দারুণ চাপ পড়ে।১১
৪
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম এমন এক সময় ঘটে যখন পাকিস্তান সরকার এরূপ কতিপয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে যা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে মুদ্রার মূল্যমান হ্রাসের পাশাপাশি পাকিস্তানে মুদ্রার মূল্যমান হ্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তান সরকার অস্বীকৃতি জানানাের পরপরই ভারত পূর্ব পাকিস্তানের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপারে যেসব সুবিধা দিয়ে আসছিল তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে কাঁচা পাটের মূল্য হাস পায় এবং এতে করে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।১২
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সর্বপ্রথম যে বৃহৎ জনসভার আয়ােজন করে তা এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পশ্চাৎপটেই অনুষ্ঠিত হয়। ভাসানীসহ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতাকেই এই জনসভার পর গ্রেপ্তার করা হয়।১৩
বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এই ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাে যে অবাঙালি পুঁজিপতিরা এই সুযােগ গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সুবিধা ভােগ করবে। পূর্ব পাকিস্তান পাট সমিতি ১৯৪৯ সালের ২৪ অক্টোবর তাদের এক সিদ্ধান্তে অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাগণ কর্তৃক পাট ব্যবসায় একচেটিয়াকরণ রােধ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরােধ জানায়।১৪ কিন্তু বিষয়টি অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় ১৯৪৯ সালে আদমজী জুট মিলস্ স্থাপিত হয় যা পাটের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।১৫ এছাড়া, তড়িঘড়ি করে গঠিত জুট বাের্ডেও কোনাে বাঙালি প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বললেই চলে।১৬ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাসদস্য সাখাওয়াৎ হােসেন তাঁর সভাপতির ভাষণে পূর্ব পাকিস্তান বণিক সমিতির নিকট বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আশঙ্কার কথাও ব্যক্ত করেন। বােম্বাইয়ের মুসলিম বণিক সম্প্রদায়ের দেশান্তরী হয়ে করাচিতে আগমন এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন প্রবাহের আশঙ্কায় “পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুঃখ-দুর্দশার ভিত্তি রচিত হয়।”১৭ এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পঙ্গুদশা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে এর রাজনৈতিক মতবিরােধ আরাে বাড়িয়ে দেয়।
পাট ব্যবসায়ের সম্ভাব্য সুবিধালাভে বঞ্চিত হয়ে বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একে জাতীয়করণের দাবি জানান। এই দাবি অবশ্য ইতােমধ্যেই মূল দাবিতে১৮ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে১৯ স্থান পায় এবং এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের পরপরই প্রকাশিত ৪২-দফা ম্যানিফেস্টোতেও এই দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ম্যানিফেস্টোর অন্যান্য প্রধান দিক হলাে: ১৯৪০ সালের লাহাের প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়াবলি ও মুদ্রাব্যবস্থা ন্যস্তকরণ; বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান; বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদকরণ এবং ভূমিহীনদের
৫
মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ; আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সমবায় কৃষিব্যবস্থা ও শিল্পশ্রমিকদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকরণ; অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন।২০
যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার উপরের দাবিগুলির প্রতি অনুকূল সাড়া দেয়নি সেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ীমহল এবং কৃষক ও শ্রমিকেরা শাসকগােষ্ঠী মুসলিম লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানী সমাজের বিভিন্ন স্তরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে এটিই প্রণিধানযােগ্য।
মুসলিম লীগের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশােধননিমিত্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করা হলেও এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যদের একটি অংশের ঈপ্সিত কতিপয় আদর্শের সঙ্গে এটিকে আপােস করতে হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, এর নামকরণ “মুসলিম” শব্দটিকে বাদ দিয়ে করা সম্ভব হয়নি, যদিও কতিপয় প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁদের যােগসূত্র থাকায় এবং সােহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতি তাঁদের অনুরাগ প্রকাশ করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে অগ্রাধিকার প্রদান করায় সােহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগের উপদলীয় শাসকগােষ্ঠী সন্দেহের চোখে দেখতেন। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এর নিম্নরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন:
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রয়ােজনে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় তখন আমাদের সংগঠনটিকে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের রূপ দিতে হয়েছিল। পাকিস্তানী জনগণের ধর্মবিশ্বাসের সুযােগ নিয়ে মুসলিম লীগ ইসলামকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বীয় ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখে। এছাড়া, মুসলিম লীগ যে বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে তা থেকে জনগণ তখনাে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে যদিও আমাদের সংগঠনটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার রূপ দেওয়া সম্ভব ছিল তথাপি তা মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাবকে মােকাবেলা করতে ব্যর্থ হতাে।২১ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির খাতিরে আপােস করার প্রবণতা আওয়ামী লীগের কর্মপরিচালনার একটি স্থায়ী কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে অবশ্য সবসময় লাভ হয়েছে সে কথা বলা যায় না। তা সত্ত্বেও বলা যায় যে এতে করে প্রায়শ সীমিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়েছে এবং তা দলকে অধিকাংশ সময়ই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।২১
Reference:
আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ – ১৯৭১ – শ্যামলী ঘোষ
Itís hard to come by experienced people on this subject, but you sound like you know what youíre talking about! Thanks
I will right away grasp your rss as I can’t find your e-mail subscription hyperlink
or e-newsletter service. Do you’ve any? Please allow me
understand so that I may subscribe. Thanks.
When I originally left a comment I appear to have clicked on the -Notify me when new comments are added- checkbox and from now on each time a comment is added I receive four emails with the same comment. Is there a way you are able to remove me from that service? Kudos!